পরিত্যক্ত এই শহরে রাতের চিত্র বীভৎস!
ODD বাংলা ডেস্ক: দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের দেশ চিলি। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ঘেঁষে লম্বা ফিতার মত প্রসারিত ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে দেশটি। সেই দেশের উত্তরে রয়েছে ‘আটাকামা’ মরুভূমি। এ মরুভূমিপৃথিবীর অন্যান্য মরুভূমি থেকে আলাদা। সেখানে ৪৫-৫০ ডিগ্রি তাপ স্পর্শ করতে পারে না। আটাকামা’র গড় তাপমাত্রা দিনে ২৭ ডিগ্রি ও রাতে ১৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি থাকে। তবুও মরুভূমিটি ভয়ংকর। বিশ্বের শুষ্কতম মরুভূমি থাকায় প্রতি ১০০ বছরে গড়ে তিন থেকে চার বার বৃষ্টিপাত হয়। তাই জীব বাসের অনুপযুক্ত আটাকামা মরুভূমিটি।
এক সময় মরুভূমিটিতে রাতারাতি গড়ে উঠে একটি শহর। সেই শহর আশ্চর্যজনকভাবে হয়ে উঠেছিল প্রাণচঞ্চল। সেখানে গড়ে উঠা বিশাল জনপদ আবারো ১০০ বছরের মধ্যেও হারিয়ে যায়। সেটি এক চাঞ্চল্যকর ইতিহাস। এখনো নিজের মরদেহ বহন করে চলেছে আটাকামা’র ভুতুড়ে নগরী ‘লা নোরিয়া’।
যেভাবে শহরের গোড়াপত্তন শুরু
আটাকামা মরুভূমির উত্তর অংশে রয়েছে কর্ডিলেরা পর্বতশ্রেণী। সেই পর্বতশ্রেণীর পাদদেশে রয়েছে মৃতনগরী ‘লা নোরিয়া’। এক সময় শহরের কোনো নাম বা নিশানাও ছিল না। এক পর্যায়ে পেরু দখল করার পর স্প্যানিশরা ১৫৫৬ সালে জানতে পারে যে, আটাকামায় পটাশিয়াম নাইট্রেটের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে।
কিন্তু হুয়ান্তাজায়ার কাছেই রুপা খনি মিললেই পটাশিয়াম নাইট্রেটের বিশাল ভাণ্ডারের কথা ভুলে যায় স্প্যানিশরা। রুপার খনি তৈরিতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা।
প্রায় ২৭০ বছর পর ১৮২৬ সালে ‘ডে লা নোরিয়া’ সল্টপিটার প্ল্যান্ট তৈরি করেন ফরাসি ব্যবসায়ী হেক্টর ব্যাকুয়ে। বারুদ তৈরিতে কাজে লাগা পটাশিয়াম নাইট্রেটের চাহিদা ইউরোপ জুড়ে ছিল ব্যাপক। ফলে অল্প দিনে ফুলে ফেঁপে উঠেছিলেন হেক্টর ব্যাকুয়ে। লাভজনক ব্যবসার খোঁজ পেয়ে এলাকাটির ওপর ঝাপিয়ে পড়ে পেরু, বলিভিয়া ও চিলির ব্যবসায়ীরা। একে একে তৈরি হয় ২১টি পটাশিয়াম নাইট্রেটের খনি ও শোধনাগার।
আটাকামা’র রুক্ষ বুকে যেভাবে ‘লা নোরিয়া’ শহরের যাত্রা
আটাকামা’র খনি ও শোধনাগারগুলোতে কাজ করতে সেখানে প্রচুর শ্রমিক আসে। শ্রমিকরা তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও আসে। তখন মাটির নীচে মিলেছিল জল। এতে রাতারাতি আটাকামা মরুভূমির বুকে গড়ে উঠে এক আধুনিক শহর। ‘ডে লা নোরিয়া’ খনিটির নামেই শহরটির নামকরণ হয় ‘লা নোরিয়া’। রুক্ষ ‘আটাকামা’র বুকে গড়ে উঠে শ্রমিকদের প্রায় ২০০ কলোনি। এতে দোকান, বাজার, হাসপাতাল, স্কুল, চার্চ, আদালত থেকে সমাধিক্ষেত্রও গড়ে উঠে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার ২২৭ ফুট ওপরে থাকা ‘লা নোরিয়া’ শহরটিকে ছুঁয়ে যায় রেললাইন। তৈরি হয়েছিল রেলস্টেশন। ১৮৭২ সালে ‘লা নোরিয়া’তে বাস করতে শুরু করেছিলেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আটাকামা’র ভেতরে সঞ্চিত থাকা তামা, নাইট্রেট ও রুপার অধিকার নিয়ে শুরু হয় লড়াই। সেই লড়াইয়ে শুরু হয় বলিভিয়া, পেরু ও চিলি।
তখন আটাকামা’র বেশ কিছু অঞ্চল পেরু ও বলিভিয়ার দখলে ছিল। ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৩ সাল পর্যন্ত চলা যুদ্ধে জিতেছিল চিলি। আটাকামা মরুভূমিও চিলির দখলে চলে গিয়েছিল। ব্যাপকভাবে পটাশিয়াম নাইট্রেট উৎপাদন করতে শুরু করেছিল চিলি। এতে আরো প্রসারিত হয়েছিল ‘লা নোরিয়া’ শহর।
‘লা নোরিয়া’ শহরের ভাগ্যে যেভাবে আসে অন্ধকার
রেলের হাত ধরেই ‘লা নোরিয়া’র পতন শুরু হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মরুভূমিটির উত্তরে পাওয়া গিয়েছিল পটাশিয়াম নাইট্রেটের আর একটি বিশাল ভাণ্ডার। ফলে ‘লা নোরিয়া’ ছাড়িয়ে রেল লাইন ৃআরো উত্তরে চলে গিয়েছিল। গড়ে উঠেছিল পোজো আলমোন্ট শহর। এতে বিবর্ণ হতে শুরু করেছিল প্রাণচঞ্চল নগরী ‘লা নোরিয়া’।
১৯০০ সালের নভেম্বর মাসে ‘লা নোরিয়া’ শহরে, বিধ্বংসী আগুন লেগেছিল। পুড়ে গিয়েছিল বহু খনি, শোধনাগার ও কলোনির বাড়িঘর। পুড়ে গিয়ে আহত ও মারা যায় অসংখ্য মানুষ। ইতিহাসবিদদের ধারণা, ‘লা নোরিয়া’ শহরকে মেরে ফেলতেই আগুন লাগানো হয়েছিল। এতে সেখানে পুড়ে যাওয়া খনি ও কারখানাগুলো চালু হয়নি ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর খনি থেকে তোলা পটাশিয়াম নাইট্রেটের বাজার পড়ে গিয়েছিল। কারণ জার্মানি কৃত্রিম পটাশিয়াম নাইট্রেট তৈরি করে ফেলেছিল। এতে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ধুঁকতে ধুঁকতে চলা ‘লা নোরিয়া’র খনি ও শোধনাগারগুলো। কাজ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। বেশিরভাগ লোক শহরটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। ফেলে গিয়েছিলেন নিজেদের হাতে গড়া স্বপ্নের শহর।
এরপরেও শহরের মায়া ছাড়তে পারেনি কয়েকশ অসহায় পরিবার। আয় বা যাওয়ার স্থান না থাকায় পরিবারের সদস্যরা প্রায় অনাহারে ও অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন। একাধিক রহস্যজনক বিষ্ফোরণে কিছু মানুষ প্রাণও হারিয়েছিলেন। ১৯২৯ সালে চিরতরে পরিত্যক্ত হয়েছিল এক সময়ের প্রাণচঞ্চল শহর ‘লা নোরিয়া’।
গুপ্তধনের সন্ধানে পরিত্যক্ত শহরে অপরাধীদের তৎপরতা
শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার পর মুখে মুখে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য ছড়িয়েছিল। ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ বছর আগে স্প্যানিশদের হাত থেকে বাঁচাতে পেরু নাকি দুটি বিশাল রত্নভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছিল। সেই জায়গাটিতেই নাকি তৈরি হয়েছিল শহরের সমাধিক্ষেত্র। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে জনমানবহীন ‘লা নোরিয়া’ চলে গিয়েছিল গুপ্তধন সন্ধানী দুর্বৃত্তরা।
যখন দুর্বৃত্তরা যন্ত্রপাতি নিয়ে ‘লা নোরিয়া’ শহর তোলপাড় করেছিল তখন সমাধিক্ষেত্র খুঁড়ে মিলেছিল শত শত কফিন। কফিনের ঢাকনা ভেঙে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়েছিল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের গুপ্তধন। মেলেনি কোনো রত্নভাণ্ডার, তবুও হাল ছাড়েনি দুর্বৃত্তরা।
মৃত শহরে পর্যটকদের অ্যাডভ্যাঞ্চার
প্রায় সাত দশক পর হঠাৎ বিস্মৃতির মৃত শহর ‘লা নোরিয়া’ প্রচারের আলোয় এসেছিল। গুপ্তধনের সন্ধান করতে গিয়ে অস্কার মুনোজ ২০০৩ সালে মৃত শহরটিতে খুঁজে পেয়েছিলেন পাঁচ-ছয় ইঞ্চির লম্বা একটি কঙ্কাল। ভিনগ্রহ থেকে আসা জীবের কঙ্কাল ভেবে পৃথিবীতে তোলপাড় হয়েছিল। এরপর থেকে ‘লা নোরিয়া’তে দলে দলে পর্যটকেরা যেতে শুরু করেন।
যদিও ‘লা নোরিয়া’ শহরে পৌঁছানো খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। পরিত্যক্ত শহরে যাওয়ার প্রধান সড়কটি বন্ধ। তবে অতি উৎসাহী পর্যটকেরা অন্য পথ ধরেন। কিছুটা পাহাড়ি পথ, কিছুটা বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এগোতে হয় শহরের দিকে। একটা সময় গাড়িও এগিয়ে যাওয়ার পথ পায় না। শুরু করতে হয় হাঁটা। হাঁটতে হয় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার।
শহরে ঢুকেই পর্যটকদের নতুন অভিজ্ঞতা
একটা দুটো নয়, শহরটিতে শত শত ভাঙা কফিন আর কঙ্কালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। শহরের শুনশান রাস্তা-ঘাটে পড়ে রয়েছে মানুষের হাড়। মাটির ওপরে উঠিয়ে আনা কফিনগুলো ভেঙে মাটির ওপরেই ফেলে গেছে গুপ্তধন সন্ধানীরা। প্রখর রোদে ফেটে গিয়েছে কফিনের কাঠ। কঙ্কালগুলো বীভৎস চেহারা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
সাহসী পর্যটকেরাও ‘লা নোরিয়া; সড়ক দিয়ে দিনের বেলা হাঁটতে ভয় পান। নিজের পদধ্বনির প্রতিধ্বনিতে চমকে ওঠেন তারা। অত্যন্ত সাহসী কিছু পর্যটক লুকিয়ে থেকে যান শহরে। তাদের উদ্দেশ্য রাতের ‘লা নোরিয়া’কে দেখা চাই। গাইডেদের বারণ সত্ত্বেও টাকার জোরে রাতের অন্ধকারে ‘লা নোরিয়া’তে ঢুকে পড়েন পর্যটকরা। আর ঢুকেই রাতের ভয়ংকর চিত্র দেখে তারা।
সূর্য ডুবলে বদলে আরেক ভয়ংকর চিত্রে ‘লা নোরিয়া’
রাতের অন্ধকারে ‘লা নোরিয়া’ প্রকাশ করে তার বীভৎস রূপ। কফিনগুলো থেকে নাকি থেকে বেরিয়ে আসে থেকে কঙ্কালেরা। সড়কে পড়ে থাকা হাড়গুলো নিজে থেকেই জোড়া লেগে যায়। দল বেঁধে কঙ্কালের দল কফিনগুলোর লাঞ্ছনাকারীদের খুঁজতে শুরু করে। রাতে থাকা লোকেরা নাকি মানুষের আর্তনাদ শুনেছেন। এমনকি অনেকে কঙ্কালের হাঁটার খটখট শব্দ, পচা মাংসের দুর্গন্ধ পেয়েছে।ে অনুভব করেছেন ঘাড়ের পাশে পড়তে থাকা গভীর দীর্ঘশ্বাস।
রাতে থাকার পরদিন সকালে অনেক সাহসী পর্যটককেও অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেছে গাইডেরা। অনেকের ধারণা, পুরোটাই অবাস্তব ও পর্যটক টানার কৌশল মাত্র। তবুও গা ছমছম করা অভিজ্ঞতার আশায় ছুটে যায় পর্যটকেরা। তাদের পদধ্বনি কান পেতে শুনে মৃত শহর ‘লা নোরিয়া’। সেই পদধ্বনিই হয়তো ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া শহরের বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে।





Post a Comment