ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ডেও আছে অযোধ্যা, রামের জন্ম তাহলে কোথায়?


Odd বাংলা ডেস্ক: ভগবান আর অবতার একার্থক নয়। অবতার হলেন তিনি যাকে অবতীর্ণ করা হয়েছে। মুসলমানগণ বিশ্বাস করেন এবং সকল জাতিই বিশ্বাস করেন যুগে যুগে দেশে দেশে স্রষ্টা/আল্লাহ্র দূত, তাদের যে নামেই ডাকা হোক, ভ্রমপ্রবণ মানুষের কাছে প্রেরিত হন। এটি সকল শাস্ত্রেরও কথা।

তাই হিন্দুদের এই রাম নামক ভগবান যদি অযোধ্যায় জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এখন সেই অযোধ্যা কোথায়? অবশ্য রামকে যদি স্বয়ং ভগবান বা স্রষ্টা মনে করা হয় তাহলে তো তার জন্মস্থানে কথা অবাস্তব হয়ে পড়ে। কারণ ভগবানের জন্মগ্রহণ বা কোনো নশ্বর মানুষের সন্তান হয়ে বিশেষ স্থানে জন্মগহণ করার কথা নিতান্তই অনুর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত। পবিত্র আল- কুরআনে স্পষ্টই বলা হয়েছে, ‘লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ’। মানে, তিনি কোনো সন্তান, যেমন মানুষের সন্তান হয়, পয়দা করেননি এবং তিনিও কারো সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। তাই অযোধ্যায় ভগবানের জন্মস্থান প্রসঙ্গটি নিতান্তই উদ্ভট কল্পনার বিষয়। অবশ্য ভারতীয় জননেতা স্বর্গীয় মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধী যে অযোধ্যায় রামচন্দ্রের আগমনের কথা বলেছেন, তার মধ্যে একই মানসিকতা কার্যকরী হয়েছে। যেমন, তিনি তার বিখ্যাত ‘রামধনু’ সঙ্গীতে লিখেছেন, “রঘুপতি রাঘব রাজা রাম/পতিত পাবন সীতারাম/ঈশ্বর আল্লাহ তেরে নাম/সবকে সুমতি দে ভগবান?”

এখানে একাধারে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ ও ‘পতিত পাবন সীতারাম’ কখনও এক হতে পারেন না। কারণ, রঘু বংশের ছেলে ‘রাজা রাম’ এবং পতিত উদ্ধারকারী সীতারাম, যাকে পরে আবার ‘ঈশ্বর আল্লাহ’ বলা হয়েছে; এক ব্যক্তি কিভাবে হতে পারে? ঈশ্বর শব্দের অর্থ যাই হোক, আল্লাহ্ মুসলমানদের বিশ্বাস মতে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং একাধারে সৃষ্টি-স্থিতি ও প্রলয়কর্তাও তিনি। তার মূলগত অর্থও হলো ‘আল-ইলাহ’ মানে, একমাত্র উপাস্য। ইসলামে দুই বা ততোধিক আল্লাহ্র কল্পনার প্রশ্নই ওঠে না। কেউ কেউ আবার রাম ও রহিমকে জুদা না করতে বলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেন। কিন্তু হিন্দুর রাম যদি ব্যক্তি হন তিনি রহীম/আল্লাহ্র সমকক্ষ হবেন কি করে? অবশ্য রামকে পরম সত্তা শ্রষ্টা অর্থে ধরা হলে কোনো কথা হয় না। কিন্তু মুসলমানদের কাছে ‘রহীম’ আল্লাহ্ শব্দেরই নামান্তর। ইসলামে আল্লাহ ৯৯টি গুণ নাম/আসমাউল হুসনা, পবিত্র নামসমূহের উল্লেখ আছে। এই নাম কিন্তু কোনো অংশীবাদী বিশ্বাসের নাম নয়। তাই রাজা রামের সঙ্গে রহীমের নয়-আবদুর রহীমের/আল্লাহ বান্দাহ প্রসঙ্গ আসতে পারে। সে কথা থাক, আমরা এখন মূল বিষয়ে আসি। হিন্দু শাস্ত্রে (সংস্কৃত রামায়ণে) যে রামের কাহিনী বিবৃত হয়েছে, তিনি ‘নরোত্তম’ রাম নামে কথিত হয়েছেন। এবং নরোত্তম রামের উপর যেসব গুণাবলী আরোপিত হয়েছে, তা নিতান্তই মানবীয়। যেমন রামচন্দ্র পিতৃ-মাতৃ বৎসল, ভক্ত-বৎসল, স্ত্রী, ভ্রাতার প্রতিও তার অপূর্ব প্রেম ও করুণার পরিচয় দেয়া হয়েছে রামায়ণে। অর্থাৎ যতগুণে মানুষে ভূষিত করা যায়, রামায়ণ কাহিনীতে রামচন্দ্রকে তার সকল গুণেরই আধার করা হয়েছে। তাই বলতে বাধা নেই, এই রাম মানুষ না হয়ে যায় না।

প্রসঙ্গত মনে রাখা প্রয়োজন, এই রামায়ণ রচনাকালে দেবর্ষি নারদ বাল্মীকিকে রামায়ণ রচনার নির্দেশ দিলে তিনি অকপটে জানিয়েছিলেন যে, তিনি রামের সম্পর্কে তো কিছুই জানেন না, এমনকি রাম নামও কোনোদিন শুনেননি। মহর্ষি তাকে রাম নাম শুনালেন এবং সেই রামের কাহিনী লেখালেন। এই যদি রামের কাহিনী হয়, তা হলে তার কোথায়ই বা বাড়ি, আর কোথায়ই বা ঠিকানা? বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথও তার একটি বিখ্যাত কবিতায় তাই যথার্থই বলেছেন,

“সেই সত্য যা রচিবে তুমি,

ঘটে যা তা সব সত্য নহে।

কবি তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান

অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।”

তাই যদি হয়, তবে রামের জন্মস্থান নিয়ে মারামারি ঝগড়াঝাঁটি কিসের? আমাদের বর্তমান লেখক একজন বিখ্যাত ভ্রমণকারী প-িত রায় শঙ্করের সফরনামার বরাত দিয়ে থাইল্যান্ডস্থ অযোধ্যায় যে রামচন্দ্রের কথা বলেছেন, হতে পারে তিনি অন্য রামচন্দ্র। থাইল্যান্ডের প্রাচীন নাম শ্যাম দেশ। এমনকি এমনও হতে পারে যে, কবি বাল্মীকি উক্ত শ্যাম দেশের (থাইল্যান্ডের) বাসিন্দা ছিলেন। কিন্তু বাল্মীকির বাক্যই প্রমাণ দিচ্ছে তিনি যে রামচন্দ্রের কথা বলেছেন, তা তার কবি-কল্পনার সামগ্রী। তবে তার কাব্যের পটভূমি ছিল তার স্বদেশ। শুধু শ্যামদেশ কেন, শ্যাম, কম্বোজ, বালি, সুমাত্রা ইত্যাদি সাগরকূলের দেশগুলোতেও রামায়ণ-মহাভারত কাহিনী অত্যন্ত জনপ্রিয়। শুধু একালে নয়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই তার জনপ্রিয়তা আছে। ভ্রমণকারী রায় শঙ্কর বলেছেন, থাইল্যান্ডে অবস্থিত ‘অযোধ্যা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি’কে থাইল্যান্ডের জাতীয় কোম্পানিরূপে দেখে এবং রামায়ণ কাহিনীর বাস্তব পটভূমি ভেবে তিনি ‘হতভম্ভ’ হয়ে গিয়েছিলেন। এটি নিতান্তই স্বাভাবিক। ভারতীয় হিন্দুদের প্রাচীন তীর্থ হিসেবে ‘শ্যাম-কম্বোজ’ অতি প্রসিদ্ধ। বিশেষ করে এখানেই আদি দেবতা  দেবাদিদেব মহাদেব) শিবের আদি তীর্থ ওঙ্কারধামও অবস্থিত।

বিখ্যাত নদী গোদাবরী তীরেই এই ওঙ্কারধাম অবস্থিত। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার বিখ্যাত কবিতা ‘আমরা বাঙালি’তে এই ওঙ্কারধাম সম্পর্কে বলেছেন, “শ্যাম-কম্বোজে ওঙ্কারধাম মোদেরি প্রাচীন কীর্তি।” বিখ্যাত হিন্দুতীর্থ ‘বরভূধর’ও এখানেই অবস্থিত। কম্বোজ হলো কম্বোডিয়া/বর্তমান কম্পুচিয়া। রামায়ণে বর্ণিত গোদাবরী নদী এখানেই অবস্থিত। কৃত্তিবাসী রামায়ণে পাই, সীতাহারা রামচন্দ্র এই গোদাবরী তীরেই সীতার জন্য বিলাপ করেন-

‘বিলাপ করেন রাম লক্ষণের আগে

ভুলিতে না পার সীতা সদা মনে জাগে

কি করিব কোথা যাবো, অনুজ লক্ষণ

কোথা গেলে সীতা পাবো, কর নিরূপণ।

গোদাবরী নীরে আছে কমল কানন,

তথা কি কমলমুখি করেন ভ্রমণ

দেখলে লক্ষণ ভাই কর অন্বেষণ

সীতারে আনিয়া দেহ বাঁচাও জীবন।’

কৌতূহলের ব্যাপার, প-িত রায়শঙ্কর লিখেছেন, রামচন্দ্র যেখানে বনবাস কাল যাপন করছিলেন সেটি নাকি বর্তমানে মালয়েশিয়ার অন্তর্গত এবং মালয়েশিয়াতে লঙ্কা নামক এক প্রাচীন দ্বীপও আছে। তবে কি লঙ্কারাজ রাবণ এই লঙ্কা দ্বীপের অধিপতি ছিলেন? এখন এই দুই লঙ্কা কি একই?


Blogger দ্বারা পরিচালিত.