স্প্যানিশ ফ্লুর আগে ‘জম্বি’ মহামারি, রহস্য মেটেনি আজো

Odd বাংলা ডেস্ক: জম্বি নামটি শুনেই করিয়ান কিংবা হলিউডের কোনো সিনেমার কথা মনে পড়েছে নিশ্চয়! একজন থেকে অন্যজন, তার থেকে আরো কয়েকজন, এভাবে পুরো শহরের মানুষ জম্বি হয়ে যাচ্ছে। সিনেমায় যদিও একটু রসদ মিশিয়ে জম্বিদের মানুষ খেকো দেখানো হয়েছে। আসল চিত্র এতোটা নিষ্ঠুর ছিল না। 

তবে যারা প্রাণ হারালেন, তারা তবু বেঁচে গেলেন। যারা শরীরে বেঁচে গেলেন, তাদের অবস্থা আরও করুণ। সারাটা জীবন যেন বেঁচে থাকতে হল ‘জম্বি’-র মতো। মাত্র ১০০ বছর আগেই ইউরোপের বুকে হানা দিয়েছিল এমন এক মহামারি, যা মানুষকে জীবিত মৃতদেহে পরিণত করেছিল। ইতিহাসে তেমন একটা আলোচনায় আসে না এই ভাইরাসটি। স্প্যানিশ ফ্লুর আগে অস্ট্রিয়ায় দেখা দিয়েছিল এই মহামারি।

বর্তমানে বিশ্ব এক মহামারি ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করছে। প্রতিকারের চেয়ে লড়াইটা বেশি প্রতিরোধের। কিছুতেই যেন বাঁধ মানছে না এই ভাইরাস। তাণ্ডব চালিয়ে চাচ্ছে প্রায় বছর দুই ধরে। পুরো বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। এই সময়টাতে স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসছে ইতিহাসের ভংকর কিছু মহামারির কথা। প্রতি ১০০ বছরে বিশ্ব মহামারির শিকার হয়েছে। মারা গেছে কোটি কোটি মানুষ। ভেঙে পড়েছিল অর্থনৈতিক অবস্থা। দেখা দিয়েছিল খাদ্যসহ নানান অভাব।    

১৯ শতকে ঘটে যাওয়া স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির কথা তো এতদিনে কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছে। তবে ঠিক সেই সময়েরই আরেক ভয়ংকর মহামারির কথা প্রায় অনালোচিতই থেকে গিয়েছে। হতে পারে এই ভাইরাসের কূল কিনারা করতে না পেরে ধামাচাপা দেয়ারই চেষ্টা হয়েছিল। তাইতো এর রহস্য খোলাসা হয়নি এই ১০০ বছরেও। এনসেফেলাইটিইস ল্যাথার্জিকা। 

১৯১৫ সাল নাগাদ অস্ট্রিয়ায় হঠাৎ আক্রমণ করে এই রোগ। আর বছর ১২-র মধ্যে সেই সংক্রমণ থেমেও যায়। তবে কোনো প্রতিষেধক তো দূরের কথা, রোগের কোনো কারণই খুঁজে পাননি চিকিৎসকরা। অন্তত ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এই মহামারিতে। তবে তারা যেন মরে বেঁচে গিয়েছিলেন। আর যারা বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। জীবনের কোনো অনুভূতিই আর কোনোদিন বুঝতে পারেননি। মস্তিষ্কের ক্রিয়া ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অনেকের। অথচ শরীর জীবিত ছিল। আর সেই শরীর নিয়েই টিকে থাকতে হয়েছিল কোনোমতে।

অস্ট্রিয়ার স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ভন ইকনমো প্রথম এই রোগের দিকে আলোকপাত করেন। তার লেখা প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, গোড়ার দিকে একটু বেশি আলস্য আর ঘুমের আধিক্য ছাড়া প্রায় কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। তবে সময় যত গড়াতে থাকে, ততই এই রোগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠতে থাকে। শুরু হয় তীব্র মাথাব্যথা। কারো কারো ক্ষেত্রে পক্ষাঘাত পর্যন্ত ঘটে যায়। তবে কীভাবে এই রোগের সংক্রমণ দেখা গেল, সে-বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দিতে পারলেন না ইকনমো। এনসেফেলাইটিস ল্যাথার্জিকা নামটা তখনও জানা যায়নি। সবাই এই রোগের নাম হয়ে গেল ইকনমো’স ডিজিজ।

ইকনমো’স ডিজিজের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ল ঠিক সেই সময়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন তুঙ্গে। ইউরোপের হাজার হাজার তরুণ যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। অস্ট্রিয়ার যুবকরাও সামিল যুদ্ধে। যুদ্ধের ভয়াবহতার কাছে ইকনমো’স ডিজিজ হারিয়ে গেল। আর যুদ্ধের ভয়াবহতা শেষ হতে না হতেই এসে পড়ল স্প্যানিশ ফ্লু। অন্তত ৫ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন সেই মহামারিতে। আর এইসব ঘটনায় যত মানুষ প্রাণ হারালেন, তার কাছে ইকনমো’স ডিজিজে মৃত মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম। তাই হয়তো ১০০ বছর পর আর তার ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা হয় না। কিন্তু যা আশ্চর্যের, তা হল মহামারি থেমে গেলেও তার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না। যেন দমকা হাওয়ার মতো এসেছিল, আবার সেভাবেই চলে গেল। 

১৯২৭ সালের পর আর এই রোগের নতুন কোনো সংক্রমণ দেখা যায়নি। আক্রান্ত মানুষদের ৪০ শতাংশই প্রাণ হারিয়েছিলেন। যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের শরীর জীবিত থাকলেও কোনো অনুভূতি ছিল না। ফলে রোগের কারণ খুঁজে পাওয়া একরকম অসম্ভব। তাও গবেষণা চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। একসময় যখন বিজ্ঞানীরা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখনই পাওয়া গেল এক নতুন সূত্র। ২০০৪ সালে ভাইরোলজিস্ট জন অক্সফোর্ড দেখলেন, মহামারির পর বেঁচে যাওয়া প্রত্যেকের গলায় ইনফেকশনের কথা শোনা গিয়েছিল। 

এরপর তিনি খুঁজে দেখলেন, যারা মারা গিয়েছেন তাদেরও গলা শুকিয়ে যাওয়ার কথা ছিল মেডিক্যাল রিপোর্টে। আর সেই সমস্ত রিপোর্ট পরীক্ষা করতে গিয়েই দেখলেন, প্রত্যেকের গলাতেই এক বিশেষ ধরণের স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া বাসা বেঁধেছিল। এখনও অবশ্য এই রোগের সঙ্গে স্ট্রেপটোকক্কাসের সম্পর্ক সরাসরি প্রমাণ করা যায়নি। তবে যে অণুজীবই দায়ী হোক, তার কোনোরকম নিরাময়ের পথ আবিষ্কার হয়নি।

তবে এই ভাইরাসের নামকরণ জম্বি হলো কেন? এই প্রশ্ন সবার মনে! আসলে জম্বি অর্থ হচ্ছে জিন্দালাশ। যে লাশ মৃত্যুর পর আবার জেগে ওঠে তা-ই জম্বি হিসেবে পরিণত হয়। জম্বি শব্দটির উৎপত্তি পশ্চিম আফ্রিকার দুটো ভাষা থেকে। গ্যাবন-এর মিতসোগো ভাষায় ‘জুম্বি’ মানে হলো ‘লাশ’। আবার কঙ্গো ভাষায় ‘জাম্বি’মানে হচ্ছে ‘মৃত ব্যক্তির আত্মা’। জম্বি না মৃত, না জীবিত; বলা যায় জীবন্মৃত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবিত ও মৃত ছোটগল্পটির মূল আভাসের সঙ্গে জম্বির ধারণার বেশ মিল রয়েছে। ওই গল্পের প্রোটাগনিস্টকে ভুলে মৃত ভেবে শ্মশানে পাঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি জেগে উঠে নিজের বাড়িতে ফিরে যান। তবে তার আচরণ ওপরে বর্ণিত জম্বির মত হয়ে যায়নি কারণ তিনি প্রকৃত অর্থে কখনো মৃত্যুবরণ করেননি।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা বেঁচে ছিলেন জিন্দালাশ হয়েই। না ছিল শরীরে কোনো শক্তি, আর না ছিল মস্তিস্কের কোনো কর্মক্ষমতা। 

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.