Odd বাংলা ডেস্ক: বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে সাগরের বুকে মাছ শিকারে নেমেছিল এক দল জেলে। মাছ শিকার করতে গিয়ে তারা পেয়ে যায় বিশ্বের রত্ন ভাণ্ডারে ভরপুর একটি জাহাজের সন্ধান। ভাণ্ডারে বিস্ময় রহস্যেঘেরা এ জাহাজে চলে টানা ৯ বছরের দুঃসাহসিক অভিযান।
‘শিনান জাহাজ’ সন্ধানের ইতিবৃত্ত
১৯৭৫ সালের ২৫ই আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ান উপ-দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পীত সাগর অঞ্চলে একটি মাছ ধরার নৌকার জেলেরা জালে ছয় টুকরো চীনা সিরামিকের জিনিসপত্র পায়। স্থানটি শিনান দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী সমুদ্র সীমায় ছিল। চীনা সিরামিকের এ জিনিসপত্র থেকেই নতুন আবিষ্কারে মোড় নেয়। পরবর্তীতে ওই স্থান থেকে বহু মূল্যবান জিনিসপত্রসহ ১৪ শতকের একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করা হয়েছিল। এ জাহাজের বেশিরভাগ জিনিসপত্র অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। আবিষ্কারের স্থানের নামানুসারে ডুবে যাওয়া জাহাজটির নাম রাখা হয় ‘শিনান জাহাজ’। গবেষকরা ‘শিনান জাহাজে’র ধ্বংসকে ডুবে যাওয়া প্রাচীন জাহাজের মধ্যে সব থেকে সম্পদে ভরপুর জাহাজ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
মধ্যযুগের মূল্যবান নিদর্শন পেয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদদের স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় স্থানটি। এরপর শুরু হয় সেগুলোর উদ্ধার অভিযান।
জাহাজটির আকার
প্রায় সাতশ বছর পানির নিচে থাকায় জাহাজটির কোনো আকার স্পষ্ট ছিল না। তবে এর ধ্বংসাবশেষ থেকে গবেষকরা একটি ধারণা দিয়েছেন। তাদের মতে জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৩২ মিটার ও প্রস্থ ১০ মিটার ছিল। আর এর ধারণ ক্ষমতা ছিল প্রায় ২০০ টন।
যেভাবে উদ্ধার জাহাজের জিনিসপত্র
মাছ ধরার নৌকার জেলেরা পানির নিচে কয়েকটি মধ্যযুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়ার পর আগ্রহী গবেষকরা সেখানকার আরো সম্পদ উদ্ধারে কর্মযজ্ঞ শুরু করেন। কোরিয়ান প্রত্নতত্ত্ববিদরা কোরিয়ান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও নৌবাহিনীর সহায়তায় এ অঞ্চলে একাধিক সামুদ্রিক খনন প্রকল্প চালু করেছিলেন। এটিই ছিল কোরিয়া পানির নিচের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ। ১৯৭৬ সালের গ্রীষ্মে শুরু হয় তাদের উদ্ধার অভিযান। আর শেষ হয় ১৯৮৪ সালে।
জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ মাত্র ২০ মিটার পানির নিচে ছিল, তবে এর সঙ্গে ডুবে যাওয়া জিনিসপত্র উদ্ধার করা মোটেও সহজ ছিল না। জোয়ার স্রোত এবং দৃশ্যমানতার অভাবের কারণে এগুলো উদ্ধার করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এজন্য বস্তুগুলো উদ্ধার করতে সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষা করতে হতো। এমনও হয়েছে যে ডুবুরিরা একদিনে মাত্র ১৫ মিনিটের মতো কাজ করতে পেরেছে। এ অভিযানের ধারাবাহিকতায় ৯ হাজার ৮০০ মানুষের ৩ হাজার ৫০০ ঘণ্টা ডাইভিং সময় লেগেছিল।
বিশাল অমূল্য রত্ন ভাণ্ডার ছিল সেই জাহাজ
গবেষক এবং ডুবুরিরা মধ্যযুগে ডুবে যাওয়া এ জাহাজের বেশিরভাগ সম্পদ অক্ষত অবস্থায়ই পেয়েছিলেন। খনন শেষে, জাহাজের ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও ২০ হাজার ৬৬৪টি সিরামিক টুকরো, ৭২৯টি ধাতব বস্তু, ৪৩টি পাথরের জিনিস, ২৮ টন চীনা মুদ্রা, ১০১৭ টুকরো লাল চন্দন কাঠ। প্রতিটি কাঠ প্রায় ১-২ মিটার দীর্ঘ ছিল। এছাড়াও ১ হাজার ৩৪৬টি অন্যান্য বস্তু উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয়, এগুলো জাহাজের নাবিকদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ছিল।
জাহাজটির গন্তব্য ও সময়কাল
এত গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান সত্ত্বেও জাহাজটির সঠিক পরিচয় অনিশ্চিত হওয়া যায়নি। সেই সঙ্গে নিশ্চিত হওয়া যায়নি এর যাত্রা শুরু কিংবা গন্তব্য স্থান। তবে জাহাজের প্রাপ্ত নমুনা থেকে গবেষকরা ধারণা করেন, সম্ভবত জাহাজটি চীনের নিংবো বন্দর থেকে জাপানের হাকাতা-কু বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। এর থেকে প্রাপ্ত নমুনা অনুযায়ী ধারণা করা হয়, জাহাজটি ইউয়ান সাম্রাজ্যের (১২৭১-১৩৬৮) সময়ে যাত্রা করে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ত্রুটির কারণে ডুবেছিল।
যেখানে মিলবে ‘শিনান জাহাজ’র মডেল
প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষ থেকে গবেষকরা এ জাহাজের একটি মডেল মডেল তৈরি করেন। জাহাজের এ মডেল ও এটি থেকে উদ্ধার করা বেশিরভাগ নিদর্শন বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার মোকপোর ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম কালচারাল হেরিটেজ-এ সংরক্ষিত আছে এবং সেখানে সেটি প্রদর্শিত হয়।





Post a Comment