পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত নারী হয়েও সফল তিনি

 


ODD বাংলা ডেস্ক: সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা না থাকলেও নির্দয়ভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত নারীর খেতাব পাওয়া মানুষটির নাম লিজি ভালসাকেজ। জন্ম থেকেই তিনি মারফানয়েড-প্রোজেরয়েড-লিপোডিস্ট্রফি সিন্ড্রোম নামক বিরল এক রোগে আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত পুরো বিশ্বে মাত্র দুইজন ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। রোগটির কারণে লিজির শরীরের গঠন আমাদের চেয়ে পুরোপুরি ভিন্ন।


তিনি সম্পূর্ণ মেদহীন একজন নারী। এমনকি তার শরীরে কোনো শক্তি সঞ্চিত হয় না এবং ওজনও বাড়ে না। তবে সব প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি আজ একজন সফল নারী। পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম দিয়ে সকল বাধাকে উপড়ে ফেলা যায়। মার্কিন এই নারীর জন্ম ১৯৮৯ সালের ১৩ই মার্চ। তার বর্তমান বয়স ৩২ বছর। 


মায়ের সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের চার সপ্তাহ আগেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। জন্মের সময় তার ওজন ছিল মাত্র দুই পাউন্ড ১১ আউন্স। সেই সময় বাবা-মায়ের সকল আনন্দ মাটি করে দিয়ে ডাক্তার জানিয়েছিল লিজি কোনো দিন কথা বলতে পারবে না, হাঁটতে পারবে না। এমনকি হামাগুড়ি দিয়েও চলাচল করতে পারবে না। 


একজন বিকলাঙ্গ নারী হিসেবেই পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে হবে তাকে। তবে ডাক্তারের কাছ থেকে এমন বার্তা পাওয়ার পরেও দমে যাননি বাবা-মা। তারা তাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সন্তানকে বড করে তুলেছেন। বর্তমানে ৩২ বছর বয়সী লিজির উচ্চতা পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। এই বয়সে একজন নারীর সর্বনিম্ন ওজন ৫৫ থেকে ৬০ কেজি হবার কথা থাকলেও তার ওজন মাত্র ২৯ কেজি। 


অনেক চেষ্টার পরেও ওজন বৃদ্ধি করতে পারেন নি তিনি। এমনকি এর বেশি ওজন বাড়ানো সম্ভব হবে না। তাই পুরো জীবনে ২৯ কেজি ওজন নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। শরীরে কোনো শক্তি সঞ্চিত না হওয়ায় প্রতি ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরে খাবার গ্রহণ করতে হয় তাকে। চার বছর বয়স থেকেই ঝাপসা হয়ে যায় তার চোখের দৃষ্টি। একসময় ডান চোখ পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যায়। অপর চোখেও স্পষ্ট দেখতে পান না। 


ভিন্নধর্মী শারীরিক গঠনের ছোটবেলা থেকেই বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন তিনি। প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার পর সহপাঠীরা তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিলেন যেন এর থেকে ভয়ানক কিছু তারা আগে কখনো দেখিনি। প্রতিনিয়ত স্কুল থেকে ফিরে বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করতেন তার দিকে এমনভাবে তাকানোর কারণ। জানতে চাইতেন কেন আশপাশের কেউ তাকে পছন্দ করে না। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল তার জীবন। 


তবে ১৭ বছর বয়সে তার জন্য টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায় মাত্র আট সেকেন্ডের একটি ভিডিও। ২০০৬ সালে হাই স্কুলে পড়ার সময় একদিন ইউটিউব দেখছিলেন লিজি। তখন ওয়ার্ল্ডস আগলিয়েস্ট ওমেন শিরোনামের একটি ভিডিও তার সামনে আসে। কৌতূহলী হয়ে সেটি চালু করতে অবাক হয়ে যান তিনি। কারণ মাত্র আট সেকেন্ডের সেই ভিডিওটি তাকে নিয়েই বানানো হয়েছিল, যা তখন চার মিলিয়ন মানুষ দেখে ফেলেছিল। ভিডিওয়ের নিচে থাকা কমেন্টগুলো ছিল আরো ভয়ানক। যেখানে অনেকেই তাকে মাথায় গুলি করে নিজেকে মেরে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিল। 


এমন ঘটনার পর সাময়িক সময়ের জন্য মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়লেও দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়ান লিজি ভালসাকেজ। একজন সুবক্তা হওয়া, নিজের লেখা বই প্রকাশ করা, স্নাতক হওয়া ও নিজের ক্যারিয়ার গঠন এবং পরিবার তৈরি করা এই চারটি লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। একে একে তার সবগুলো লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। ২০১২ সালে তিনি কমিউনিকেশন স্টাডিজে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। প্রকাশ করেছেন নিজের বেশ কিছু বই। যার মধ্যে রয়েছে 'বি বিউটিফুল, বি ইউ', 'চুজিং হ্যাপিনেস', 'ডেয়ার টু বি কাইন্ড'। 


জনসচেতনতা, অ্যান্টি-বুলিং, মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে নিয়মিত প্রেরণা উদ্দীপক বক্তব্য দিয়ে থাকেন তিনি। লিজি ভালসাকেজ নামে তার একটি ইউটিউব চ্যানেলও আছে। যেখানে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা আট লক্ষ ৫৯ হাজার। একই নামে একটি ভারিফাইড ভেরিফাইড ফেসবুক পেজও আছে তার। পেজটির ফলোয়ারের সংখ্যা ১.২ মিলিয়ন। এসব মাধ্যমে নানা অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও আপলোড করে থাকেন তিনি।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.