যে বিদেশি মেয়েটি হয়ে উঠলেন ঠাকুরবাড়ির বধূ
ODD বাংলা ডেস্ক: জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রতিটি সদস্যই প্রতিভার একেকটি জাদুকাঠি। দেশে বিদেশে তারা স্বমহিমায় আকৃষ্ট করতেন সবাইকে। চেকোস্লোভাকিয়ার মেয়ে মিলাডা সেইভাবেই মুগ্ধ হয়েছিলেন তরুণ ভারতীয় ছাত্র মোহনলালের সঙ্গে আলাপ করে। পৃথিবীর দুই ভিন্ন দেশের মানুষকে সেদিন একসূত্রে বেঁধেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ঘটনাটা গল্পের মতো মনে হলেও সত্যি। গল্পের শিকড়ে প্রবেশ করার আগে মোহনলালের পরিচয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি ছিলেন মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়, অবনীন্দ্রনাথের অকালমৃতা মেয়ে করুণার সন্তান। করুণা তিনটি শিশুসন্তান রেখে চিরঘুমের দেশে চলে যান। তখন তারা জোড়াসাঁকোর বৈঠকখানা বাড়িতেই এসে থাকতেন। করুণার তিন সন্তান বড়ো হয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথের বড়ো ছেলে অলকেন্দ্রের স্ত্রী পারুলের স্নেহছায়ায়। অবনঠাকুরের খেয়ালিপনা, তার চিত্রশিল্প, রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক চর্চা, মায়ের স্মৃতি— এই সবকিছুই মোহনলালের ব্যক্তিত্বকে তৈরি করেছিল। নিজে ছিলেন পরিসংখ্যানবিদ। পরে ‘দক্ষিণের বারান্দা’ লিখেছিলেন, জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ির উত্থান পতনের গল্প। আজকের আলোচনার কেন্দ্রে কিন্তু মোহনলাল নয়, থাকবেন তার স্ত্রী মিলাডা গাঙ্গুলি।
কোনো এক শীতের সন্ধ্যায় গান শুনতে এসে চেকোস্লোভাকিয়াবাসী এক তরুণী ভারতীয় এক তরুণকে দেখে আলাপ জমালো। দুজনের মধ্যে অদৃশ্য সেতুর মতো ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের লেখা দি গার্ডেনার এবং গীতাঞ্জলির চেক অনুবাদ পড়েছিলেন মিলাডা। পড়ে মু্গ্ধ হয়েছিলেন। কথায় কথায় জানতে পারলেন মোহনলাল তার প্রিয় কবির আত্মীয়, মিলাডা মুগ্ধ হলেন। তারপর দুই ভিনদেশির বন্ধুত্ব গড়ালো প্রেমের দিকে। পরিচিতরা বাধা দিয়েছিলেন। আসলে মিলাডা আদৌ ভারতীয় পরিবারের যথাযথ অংশ হয়ে উঠতে পারবেন কিনা? এ নিয়ে সবার মনেই মেঘ জমেছিল। কিন্তু অন্তরের টান কি উপেক্ষা করা অত সহজ? তাই গোপনেই বিয়েটা সারলেন তারা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাজটা সহজ ছিল না। চেকোস্লোভাকিয়ার উপর ঘনিয়ে আসতে পারে জার্মানির আক্রমণ। মোহনলাল দেশে ফিরে আসার আগে মিলাডাকে লন্ডনেই ফিরে আসতে বলেছিলেন। ভারতে যাওয়ার জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বিশেষ অনুমতি নিয়ে বাবা-মার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য তার অদর্শনে মায়ের শারীরিক অসুস্থতার কথা জোরের সঙ্গে বলেছিলেন। কিন্তু বিধাতার আশ্চর্য খেলায় ১৯৩৯ সালের পর মা ও মেয়ের আর দেখা হয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রবল অভিঘাতে ঠাকুরবাড়ির এই বিদেশি বধূ নিজের শিকড় ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছিলেন। স্বদেশ থেকে ফেরার পথে তিনি ছিলেন একা। যুদ্ধের কারণে যান চলাচল বিপর্যস্ত। তবু রবি ঠাকুরের দেশে তার জন্য অপেক্ষা করছেন স্বামী মোহনলাল। সব বাধা উপেক্ষা করে কালো কাচে ঢাকা জাহাজে করে কলকাতায় পৌঁছলেন মিলাডা। বোম্বে শহরে মোহনলালের দেওয়া উপহার গিয়ে পৌঁছয় তার কাছে। বাঙালি মেয়েদের তখনকার দিনের সাজপোশাক— শাড়ি! জাহাজের এক মহিলার সাহায্য নিয়ে সেই শাড়ি পরেই ভারতে পৌঁছলেন মিলাডা। হাতে পেলেন পদ্মগুচ্ছ, শঙ্খ বাজিয়ে অভ্যর্থনা করেছিল ঠাকুরবাড়ি।
অবনীন্দ্রনাথ ছবি আঁকছিলেন সাধকের মতো। সেইসময় যেন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতো বলেছিলেন মিলাডার অভিভাবকদের সঙ্গে তার চিরবিচ্ছেদের কথা। শান্তিনিকেতনে গিয়ে হাতের কাজ শিখলেন। প্রথমে সাঁওতালদের নিয়ে কাজ শুরু করলেও পরে মনিপুরী এক রাজকন্যার সাহায্যে নাগাল্যান্ড গিয়েছিলেন মিলাডা। সেখানে নিবিসা চাসি নামে এক নাগা তরুণ মিলাডাকে নাগা সমাজের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে সাহায্য করেন। চেক ভাষায় নাগাদের নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন মিলাডা।
এরপর জীবনের বিভিন্ন সময় লিখেছিলেন আরো দুটি ইংরেজি বই— ‘আ পিলগ্রিমেজ টু দ্য নাগাজ’ এবং ‘নাগা আর্ট’। দুর্লভ ছবিও রয়েছে বইদুটিতে। চেক, বাংলা, ইংরেজি — এই তিন ভাষাতেই সমান দক্ষ ছিলেন। তিন ভাষাতেই বই লিখেছেন। রূপকথা সংগ্রহ করেছেন, মোহনলালের সঙ্গে যৌথ অনুবাদের কাজও করেছেন। ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। সাউথ পয়েন্ট স্কুলের শিশু বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন।
জীবনে হয়তো প্রতিটি মানুষের কাজ নির্দিষ্ট থাকে। যাকে আমরা বলি কপালের লিখন। নাহলে সুদূর চোকোস্লোভাকিয়ার একটি অচেনা মেয়ে কেমন করে ঠাকুরবাড়ির বধূ হয়ে উঠবেন?





Post a Comment