কুষ্টিয়ার বিনোদ পাল যেভাবে ‘জাপানের জাতীয় বীর’
ODD বাংলা ডেস্ক: জাপানের কিয়োটো শহরে আজও সদর্পে দাঁড়িয়ে কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত শালিমপুর গ্রামের রাধা বিনোদ পালের ভাস্কর্য। শুধুই কি ভাস্কর্য? তার নামে আছে দেশটির রাজধানী টোকিওতে সুপ্রশস্ত রাজপথ, গড়া হয়েছে জাদুঘর। সম্রাট হিরোহিতো তাকে ভূষিত করেছেন জাপানের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘কোক্কা কুনশোও’ পদকে।
হিরোহিতো জাপানের সম্রাট থাকাকালে বলেছিলেন, ‘যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু।’ সম্রাট হিরোহিতো একজন বাঙালিকে লক্ষ্য করে এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং এটি ছিল একজন বাঙালির প্রতি জাপানের কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ।
যে মানুষটির জন্য আজও বাংলাদেশিদের কৃতজ্ঞচিত্তে সম্মান জানায় জাপানিরা, সেই মানুষটাকে চেনেন? বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই তিনি অপরিচিত। এমন প্রশ্নও তো জাগতে পারে, কেন তাকে জাপানিরা আজও মনে রেখেছে?
আজকের জাপানের উন্নতির পেছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল রাধা বিনোদ পালের। তারা সেই অবদান ভোলেনি। আর তাই ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে ভারত সফরে এসে রাজ্যসভার অধিবেশনে দাঁড়িয়ে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন রাধা বিনোদ পালকে। কলকাতায় কৃতজ্ঞচিত্তে সাক্ষাৎ করেন তার বৃদ্ধ ছেলের সঙ্গে।
কে এই বিনোদ পাল?
রাধা বিনোদ পালের জন্ম ১৮৮৬ সালে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ছালিমপুর গ্রামে। তার বেড়ে ওঠা বেড়ে রাজশাহীতে। ১৯০৩ সালে এন্ট্রান্স ও ১৯০৫ সালে এফএ পাস করেন রাজশাহী থেকে। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে অনার্স পাস করেন ১৯০৮ সালে।
বিনোদ পালের পরিচয় ছিল একজন বাঙালি শিক্ষক ও আইনজীবী হিসেবে। তার কর্মজীবনের শুরুটা হয় ময়মনসিংহে, আনন্দমোহন কলেজের গণিতের শিক্ষক হিসেবে। শিক্ষকতার পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়াশোনাও চালিয়ে যান, দায়িত্ব পালন করেন কলকাতা ল কলেজের অধ্যাপক হিসেবেও।
১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৪৬ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ছালিমপুরে ফিরে আসেন। কিন্তু সে বছরই এপ্রিল মাসে তিনি আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ পান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বিচার
জাপানি সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে, ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর আচমকা যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার আক্রমণ করে। ওই হামলায় ২৪০৩ সেনাকর্মী ও বাসিন্দা মারা যায় এবং ১৪২৭ জন আহত হয়। কেবল তাই নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাবাহিনী অজস্র গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট চালিয়েছিল। গণহত্যার মধ্যে সুক চিং ও নান জিং গণহত্যা ছিল অন্যতম। প্রায় দুই লাখের বেশি নারীকে ধর্ষণ ও যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করেছিল জাপানি সেনাবাহিনী, যারা পরে 'কমফোর্ট উইমেন' নামে পরিচিতি পায়।
এ ছাড়া মিত্রশক্তির বহু যুদ্ধবন্দী সৈন্যকেও নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করেছিল জাপানি বাহিনী। বন্দীদের ওপর জীববিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণা চালানো হয়েছিল। জাপানের সম্রাট শোয়ার অনুমোদনে যুদ্ধে জৈব ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে জাপান। পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল সিম্পোসিয়াম অফ দ্য ক্রাইমস অফ ব্যাক্টেরিওলজিকাল ওয়ারফেয়ার এর গবেষণায় দেখা যায় জাপানের জৈব ও রাসায়নিক হামলায় পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ নিহত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই বিজয়ী মিত্রশক্তি সিদ্ধান্ত নেয় যে, যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধের সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের জন্য প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, সেনা কর্মকর্তা ও যুদ্ধাপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট আরো কিছু ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনবে। মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের নির্দেশে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জাপানিদের বিচারের জন্য গঠিত হয় 'ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট', যা টোকিও ট্রাইবুনাল নামে পরিচিত।
ডগলাস ম্যাকআর্থার জাপানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করেন। অভিযুক্ত করা হয় ২৮ জন জাপানি রাজনীতিবিদ, সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাকে। এই ট্রাইব্যুনালের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন অস্ট্রেলিয়ান বিচারপতি স্যার উইলিয়াম এফ ওয়েব।
টোকিও ট্রায়ালে ১১ জন বিচারককে অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিচারকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাধা বিনোদ পাল। বাকি দশ জন বিচারক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড ও ফিলিপিন্সের নাগরিক।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলসের ইতিহাসের অধ্যাপক বিনয় লাল বলেন, কোন কোন দেশ থেকে বিচারক জুরি বোর্ডে রাখা হবে, বিবিধ যুক্তির ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডিং অফিসার জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার। ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে, সেসময় এমন একজন বিচারককে এই ট্রাইব্যুনালের অংশ রাখা হয়েছিল, কারণ ভারত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের অংশগ্রহণ ছিল।
১৯৪৬ সালের পোস্টডাম সনদ ডগলাস ম্যাকআর্থারকে বিচারক নির্বাচনের এই ক্ষমতা দিয়েছিল। অধ্যাপক বিনয় লাল বলেন, পোস্টডাম সনদে স্বাক্ষর করা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীন জাপানকে 'শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ' করার দাবি জানায় এবং ঘোষণা দেয় যে 'যুদ্ধাপরাধীদের কঠোর বিচার' করা হবে। ট্রাইব্যুনালও শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হওয়া যুদ্ধাপরাধ বিবেচনা না করে ১৯৩১ সালে জাপানের মাঞ্চুরিয়া দখল থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের অপরাধ পর্যন্ত সব যুদ্ধাপরাধের বিচার করার এখতিয়ার নেয়।
এই ট্রায়ালে অভিযুক্তদের তালিকা থেকে জাপানের তৎকালীন সম্রাট হিরোহিতোকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যে ধরণের অভিযোগ আনা হয়েছিল, টোকিও ট্রায়ালেও অভিযোগের ধরণ একইরকম ছিল। অভিযুক্ত জাপানি শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিন ধরণের অপরাধের অভিযোগ আনা হয়- শান্তিবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ।
বিচারে রাধা বিনোদ পালের ভূমিকা
অধ্যাপক বিনয় লাল বলেন, ট্রাইব্যুনালের অধিকাংশ বিচারক যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং শান্তিবিরোধী অপরাধের দায়ে জাপানের নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করলেও রাধা বিনোদ পালের রায় ছিল তাদের বিপরীত।
ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রাধা বিনোদ পালের প্রধান প্রশ্ন ছিল, যারা জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল গঠন করার এবং নিজেদের শর্ত অনুযায়ী পরাজিত শত্রুদের বিচার করার নৈতিক অধিকার আছে কি-না। ট্রায়ালে জাপানকে যেসব অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হচ্ছে, অভিযোগকারী পক্ষরা নিজেরাই সেসব অপরাধ সংঘটন করে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই।
বিচারক পাল তার রায়ে মন্তব্য করেন যে, তৎকালীন সময়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সের মত যেসব দেশের উপনিবেশ ছিল বিভিন্ন অঞ্চলে, সেসব দেশের মানুষের ওপর যুদ্ধকালীন সময় ছাড়াও তারা শান্তি বিরোধী ও মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। এছাড়া জাপানের বিরুদ্ধে আনা অপরাধের অভিযোগে অপরাধের মাত্রা অতিরঞ্জিত করেও উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও তার বিচারে মত প্রকাশ করেন বিচারক পাল।
নেদারল্যান্ডস ও ফিলিপাইনের একজন বিচারপতি রাধা বিনোদকে যদিও নৈতিক সমর্থন জুগিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়কে অনেকটা বাধ্য হয়েই মেনে নিয়েছিলেন।
বিনোদ পালের রায় নিষিদ্ধ করে মার্কিন বাহিনী
মজার বিষয় হল, রাধা বিনোদ পালের ৮০০ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জাপানে সেটিকে নিষিদ্ধ করে অধিগ্রহণকারী মার্কিন বাহিনী। আর ঠিক যেদিন মার্কিন বাহিনী জাপান ছেড়ে যায়, ঠিক সেদিন রায়টি জাপানে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে রাধা বিনোদ পাল দু'বার জাপানে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে সফর করেন।
এমদাদ হাসনায়েন ও সারিয়া সুলতানা তাদের 'কুষ্টিয়ার ইতিহাস' বইয়ে উল্লেখ করেছেন, টোকিও ট্রায়াল' ধাপে এই বাঙালি বিচারকের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই জাপান অনেক কম ক্ষতিপূরণের উপর বেঁচে গিয়েছিল। নয়তো যে ক্ষতিপূরণের বোঝা মিত্রপক্ষ ও অন্য বিচারকরা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তার দায় এখন পর্যন্ত টানতে হত জাপানকে।
১৯৬৬ সালের অক্টোবরে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো তাকে জাপানের সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক খেতাব 'ফার্স্ট অর্ডার অব সেক্রেড ট্রেজার' প্রদান করেন। জাপানের নিহন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভূষিত করেছে সম্মানসূচক LL.D উপাধিতে। টোকিও এবং কিয়োটো শহরের মেট্রোপলিস গভর্ননেরা তাকে 'ফ্রিডম অব দ্যা সিটি অব টোকিও ও কিয়োটো' সম্মানে ভূষিত করেছিল। তার সম্মানে ইয়াসুকুনি মঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। রাজধানী টোকিওতে সুপ্রশস্ত রাজপথের নাম রাখা হয়েছে তার নামানুসারে।





Post a Comment